বাড়ির গাছে রূপচর্চা

 

বাড়ির গাছের আম, লেবু, পেঁপে, শজনে এমন আরও কত কী খাওয়ার সুন্দর সময়গুলো হারিয়ে যাচ্ছে। আধুনিকতার জালে জড়িয়ে নিখোঁজ হয়ে যাচ্ছে ‘বাড়ির গাছ’। তবু কোনো বাড়ির ছাদে ফুটে ওঠে অলকানন্দার হলদে মায়া, কারও বারান্দা রঙিন হয়ে ওঠে নয়নাভিরাম নয়নতারা বা কলাবতী ফুলের রঙে। কোথাও স্নিগ্ধতা আসে কাঠগোলাপের সুবাসে। টুকটাক বাগান করার সময়-সুযোগ পেলে বাড়িতে এমন কিছু গাছও লাগানো যেতে পারে, যেগুলোর সাহায্যে বাড়িতেই সহজে হতে পারে রূপচর্চার আয়োজন।


 

রোদ-ধুলা-বালু থেকে ত্বকে অস্বস্তি হয়, একে নিয়ন্ত্রণে রাখতে তুলসী দারুণ কার্যকর। ত্বককে উজ্জ্বল করতে, দাগ ও বলিরেখা কমাতে কাজে লাগবে হলুদ। পুদিনাপাতা অতিসংবেদনশীল ত্বকের জন্য সবচেয়ে ভালো (যেমন, রোদে গেলেই যাঁদের মুখের ত্বক লাল হয়ে যায় কিংবা রাসায়নিকের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় যাঁদের ত্বক পাতলা হয়ে গেছে), ব্রণের সমস্যায় কাজে আসবে আর পাতার শিরা (নরম শাখা) কাজে লাগে চুলের যত্নে। চুল আর ত্বকের জন্য ব্যবহার করতে পারেন অ্যালোভেরা। এই সব গাছই লাগানো যেতে পারে ছাদবাগান বা বারান্দার টবে। কিন্তু কোন গাছের কোন অংশ কীভাবে ব্যবহার করতে হবে, তা না জানলে হতে পারে হিতে বিপরীত। বাড়ির গাছে রূপচর্চার এমন নানা পরামর্শ দিলেন হার্বস আয়ুর্বেদিক স্কিন কেয়ার ক্লিনিকের আয়ুর্বেদিক রূপবিশেষজ্ঞ আফরিন মৌসুমী।


 

তুলসী

এক কাপ তুলসীপাতা নিয়ে রস করুন। ২ কাপ পানির সঙ্গে জ্বাল করুন। ঠান্ডা করে কিউব আকারের ছাঁচে পুরে ডিপ ফ্রিজে রাখুন। টোনার হিসেবে প্রতি রাতে ঘুমানোর আগে একটি কিউব মুখে ঘষে নিন। মুখ শুকিয়ে যাওয়ার পর ময়েশ্চারাইজার আবশ্যক।

ত্বকে ফুসকুড়ি, ব্রণ হওয়ার প্রবণতা বেশি হলে তুলসীপাতা নিন এক কাপ, রস করে হালকাভাবে গরম করুন। এক চা–চামচ চালের গুঁড়া ও এক চা–চামচ বেসন (মুগডালের) মিশিয়ে নিন। প্রতিদিন মুখে লাগিয়ে ১০ মিনিট পর ধুয়ে ফেলুন।

হলুদ

হলুদের রস নিন ২ টেবিল চামচ। ফুটিয়ে ঠান্ডা করে এতে এক টেবিল চামচ জিরা (গোটা) ভিজিয়ে রাখুন ১০ মিনিট। এরপর বেটে বা পেস্ট করে নিন। যোগ করুন ৩-৪ ফোঁটা লেবুর রস ও এক চা–চামচ তরল দুধ (গুঁড়া দুধ নয়)। মুখে লাগিয়ে ২০ মিনিট পর ধুয়ে ফেলুন। ত্বকে বেশি দাগ–ছোপ থাকলে (যেমন মেছতার দাগ খুব গাঢ় হয়ে থাকলে) প্রতিদিনও ব্যবহার করা যায়।

পুরো শরীরেও ব্যবহার করতে পারেন হলুদের প্যাক। শরীরের বিভিন্ন অংশে রঙের অসামঞ্জস্য (যেমন ঘাড়, বগল বা পেটে ছোপ ছোপ দাগ) থাকলে হলুদের রস নিন এক কাপ। ফুটিয়ে ঠান্ডা করে এতে চালের গুঁড়া এক কাপ, টক দই এক কাপ, লেবুর খোসাবাটা ২ টেবিল চামচ, লেবুর রস ২ টেবিল চামচ, বাদামি চিনি (ব্রাউন সুগার) আধা কাপ, কফিগুঁড়া আধা কাপ মিশিয়ে নিন। প্রয়োজনে এই অনুপাত ঠিক রেখে পরিমাণ কমবেশি করে নিন। শরীরে লাগানোর পর ১০ মিনিট অপেক্ষা করুন। এরপর ঘষে ঘষে তুলে ফেলুন। সপ্তাহে ১-২ দিন ব্যবহার করুন।


লেবু

লেবুর রস নিন আধা কাপ, ফোটানো পানি আধা কাপ। এতে আধা কাপ মেথি ও আধা কাপ মৌরি দিয়ে ভিজিয়ে রাখুন সারা রাত। সকালে সব একসঙ্গে বেটে চুল ও মাথার ত্বকে লাগিয়ে রাখুন ২০ মিনিট। যাঁদের শীতের সময় খুশকির সমস্যা খুব বেশি হয়, তাঁরা গরমের সময় থেকেই সপ্তাহে ১-২ দিন এভাবে চুলের যত্ন নিলে শীতে আর এমনটা হয় না।

আধা লিটার ঠান্ডা পানিতে ছোট একটি লেবু মিহি স্লাইস করে দিয়ে ঢেকে রাখুন ১০-১৫ মিনিট। এরপর ওই পানিতে মুখ ধুয়ে ফেলুন (লেবু কচলানো যাবে না)। প্রতিদিনই রোদ থেকে ঘরে ফিরে এটি ব্যবহার করুন। রোদপোড়া ভাবটা থাকবে না। বাড়িতে যেদিন থাকবেন, সেদিনও ব্যবহার করা যাবে চাইলে।

ত্বকে খুব বেশি দাগ–ছোপ বা ত্বকের কোনো অংশে কালচে ভাব থাকলে আধা লিটার পানিতে ছোট একটি লেবুর মিহি স্লাইস নিয়ে বরফের কিউব করে রাখুন। ত্বকের দাগ–ছোপের স্থানটুকুতে ঘষে লাগিয়ে নিন সপ্তাহে চার দিন।


অ্যালোভেরা

ঘৃতকুমারী বা অ্যালোভেরার রস (জেল) বের করে নিন ১ কাপ পরিমাণ। এতে ঢেলে নিন ২ কাপ ফুটন্ত গরম পানি। ১০ মিনিট পর ছেঁকে নিয়ে ব্যবহার করুন। এটিই ব্যবহারোপযোগী জেল। এই অনুপাতে প্রয়োজনমতো জেল তৈরি করে নিয়ে বানিয়ে ফেলুন প্যাক (চাইলে এই জেল ২-৩ দিন ফ্রিজে রেখেও ব্যবহার করতে পারেন):

অ্যালোভেরা জেল নিন এক টেবিল চামচ। যোগ করুন হলুদের রস দুই চা-চামচ (ফোটানো)। আরও নিন এক টেবিল চামচ বেসন (মুগডালের), ২-৩ ফোঁটা গ্লিসারিন এবং ২-৩ ফোঁটা জলপাই তেল। মিশ্রণটি ত্বকে লাগিয়ে ১০-১৫ মিনিট পর ধুয়ে ফেলুন। প্রতিদিনই ব্যবহার করতে পারেন কোমল ত্বকের জন্য।

অ্যালোভেরা জেল নিন ২ চা-চামচ, কাঁচা আমলকীর রস ৬ টেবিল চামচ, সঙ্গে নিন ৩-৪ ফোঁটা জলপাই তেল বা তিলের তেল কিংবা বাড়িতে তৈরি খাঁটি নারকেল তেল। এই প্যাক শুধু মাথার ত্বকে লাগিয়ে ১ ঘণ্টা পর ধুয়ে ফেলুন। সপ্তাহে ১ দিন ব্যবহারে চুলের উজ্জ্বলতা বাড়বে। গরমের সময় কিংবা ভেজা আবহাওয়ায় মাথার ত্বকের স্থানে স্থানে চুলকায় বা ফুসকুড়ি হতে দেখা যায়। সপ্তাহে একদিন অ্যালোভেরা জেল ২ টেবিল চামচ, কাঁচা আমলকীর রস ৬ টেবিল চামচ এবং ৩-৪ কোয়া রসুন একসঙ্গে বেটে নিয়ে তেলহীন, পরিষ্কার মাথার ত্বকে (চুলে নয়) লাগিয়ে রাখুন ১ ঘণ্টা। এরপর শ্যাম্পু করুন। সমস্যা বেশি হলে সপ্তাহে ২-৩ দিনও ব্যবহার করা যায়।

পুদিনা

পুদিনাপাতা ছিঁড়ে রস করে ফুটিয়ে নিন। এই রস নিন ১ টেবিল চামচ, সঙ্গে অ্যালোভেরার জেল এক টেবিল চামচ (আগের নিয়মে তৈরি জেল)।
এক টেবিল চামচ বেসন (মটর ডালের) যোগ করুন এতে। ২-৩টি লং বেটে দিন। মিশ্রণটি পুরো মুখে লাগিয়ে রাখুন ১০ মিনিট, সপ্তাহে ৩ দিন। ত্বকে লং দিলে একটু জ্বলতে পারে, ভয়ের কিছু নেই।

পাতা ছেঁড়ার পর যে শিরা রয়ে যায়, সেটি নিন একমুঠ। ভালোভাবে বেটে এতে এক কাপ আমলকীগুঁড়া, আধা কাপ মেথিগুঁড়া ও আধা কাপ শিকাকাইগুঁড়া দিয়ে চুলের প্যাক তৈরি করতে পারেন। চাইলে এই তিনটি উপকরণ গুঁড়া হিসেবে না নিয়ে গোটা অবস্থায়ও নিতে পারেন। তবে সে ক্ষেত্রে গরম পানিতে এগুলো সারা রাত ভিজিয়ে এরপর বাঁটতে হবে। উল্লিখিত পরিমাণেই বাটা উপকরণ যোগ করতে হবে পুদিনাপাতার শিরা বাটার সঙ্গে। গুঁড়া বা গোটা যেমন উপকরণেই প্যাকটি তৈরি করুন, এটি অপরিষ্কার মাথায় লাগাবেন না।
শ্যাম্পু করে (এরপর চুল ময়লা না করে, তেল না লাগিয়ে) পরদিন সকালে এই প্যাক চুলে ও মাথার ত্বকে লাগিয়ে রাখতে পারেন আধা ঘণ্টা থেকে এক ঘণ্টা। এরপর চুল ধুয়ে ফেলুন (শ্যাম্পু করবেন না ওই দিন)। পরদিন শ্যাম্পু করা যাবে। সপ্তাহে এক দিন
ব্যবহার করলেই চুল ভালো থাকবে, তবে চুল পড়ে যাওয়ার সমস্যা
থাকলে সপ্তাহে ২-৩ দিন ব্যবহার করা ভালো।

 

 

 

 

 

Post a Comment

0 Comments